ঢাকা , সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ , ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এইচআরডব্লিউ

​রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অনির্দিষ্টকাল বিনাবিচারে আটকে রাখা বন্ধ করুন

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ২৪-০৮-২০২৬ ০২:২৭:৪২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৪-০৮-২০২৬ ০২:২৭:৪২ অপরাহ্ন
​রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অনির্দিষ্টকাল বিনাবিচারে আটকে রাখা বন্ধ করুন ​ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও অন্যদের অনির্দিষ্টকাল ধরে বিনাবিচারে আটকে রাখা বন্ধের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

সোমবার (২৪ আগস্ট) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, ২০২৪ সালের অগাস্টে কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর পুলিশ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থককে আটক করে। তাদের মধ্যে শত শত ব্যক্তি এখনও কারাগারে রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে এখানো সুনির্দিষ্ট অভিযোগই দাখিল করা হয়নি।

এইচআরডব্লিউ বলছে, শেখ হাসিনা সরকারের ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন। তবে আন্দোলনকারীদের হত্যার অভিযোগে অনেককে কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই বয়স্ক এবং কেউ কেউ গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। তাদের জামিন ও চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে।

সংস্থাটির ভাষ্য, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে কারাগারে অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী মারা গেছেন। তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, এক সরকারের পর আরেক সরকারের আমলে কোনো প্রমাণ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রতিপক্ষের শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তার উচিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় ধরে খেয়ালখুশিমত আটকে রাখা বন্ধ করা।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি বলছে, সংস্কার না করে বর্তমান রূপে ওই বিল পাস হলে নতুন কমিশন এসব খেয়ালখুশিমত গ্রেপ্তারের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না।

বিবৃতিতে বলা হয়, বিনা অভিযোগে আটকদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য, হাসিনা প্রশাসনকে সমর্থক অন্যান্য দলের সাবেক আইনপ্রণেতা এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দেওয়া সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরা রয়েছেন।

এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অন্যদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, গুম ও দুর্নীতির মত গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রসিকিউটররা বারবার এমন সব মামলায় জামিন নামঞ্জুর করার আবেদন করেছেন, যেখানে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। নিম্ন ও জেলা আদালতগুলো ধারাবাহিকভাবে জামিন নামঞ্জুর করছে এবং হাই কোর্ট জামিন দিলেও সরকারি কর্তৃপক্ষ নতুন মামলায় তাদের আটকে দিচ্ছে।

এর উদাহরণ হিসেবে ৮২ বছর বয়সী সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের কথা বলা হয়েছে বিবৃতিতে।

এক আন্দোলনকারীকে হত্যার অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের তিন মাসে দুর্নীতিসহ আরও চারটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। প্রতিটি মামলায় নিম্ন আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে।

কারাগারে এ বি এম খায়রুল হকের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল বলে পরিবার এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছে। হাই কোর্ট তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করলেও ২০২৬ সালের ১০ মার্চ (শেষ মামলায় জামিন পাওয়ার আগের দিন) পুলিশ তাকে নতুন দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মুক্তি আটকে দেয়।

নতুন ওই দুই মামলায় নিম্ন আদালত জামিন নামঞ্জুর করলেও ১২ মে হাই কোর্ট তাকে জামিন দেয়। কিন্তু তিনি মুক্তি পাওয়ার আগেই পুলিশ আরও একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখায়। আগের একটি মামলায় যে সময়ে তাকে ঘটনাস্থলে থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিল, নতুন মামলাটিতেও ঠিক একই সময়ে তিনি ১০ কিলোমিটার দূরে আরেকটি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়।

এভাবে হাই কোর্টের জামিন এবং পুলিশের নতুন মামলা দায়েরের চক্র চলতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপে ১৯ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। এই পুরো সময়ে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।

অন্য আটক ব্যক্তিদের আইনজীবীরা এইচআরডব্লিউকে বলেছেন, তারা এখন তাদের মক্কেলদের জামিন চাইতে নিরুৎসাহিত করছেন। কারণ জামিন পেলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে নতুন মামলা করে দেয় বলে তাদের আশঙ্কা।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এক বছরের বেশি সময় অভিযোগ ছাড়াই কাউকে আটক রাখার সুযোগ দেয় কেবল লিখিতভাবে উল্লেখ করা ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল যাদের গ্রেপ্তার দেখিয়েছে, সেই দেড় শতাধিক ব্যক্তির কাউকেই জামিন দেওয়া হয়নি। জামিন প্রত্যাখ্যাত হলে তাদের আপিলের অধিকারও নেই।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর বয়স ৮১ বছর। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ট্রাইব্যুনাল প্রথম তাকে আটক করে। এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ ছাড়াই তিনি ২২ মাস ধরে আটক রয়েছেন।

এইচআরডব্লিউ বলছে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি জামিন চাইলে আদালত তা মঞ্জুর করেনি এবং কোনো ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির’ কথাও বলেনি। বরং বিচার কার্যক্রম দুই দফা মুলতবি করা হয়েছে। সর্বশেষ তা অগাস্টের শেষ পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

সাবেক সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদারের ২২ মাস ধরে ট্রাইব্যুনালের হেফাজতে থাকার কথাও বলা হয়েছে এইচআরডব্লিউ।

তার পরিবার এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছে, কারাগারে থাকা অবস্থায় তার পায়ে গ্যাংগ্রিন হয় এবং তিনটি পায়ের আঙুল কেটে ফেলতে হয়। পড়ে গিয়ে তার কোমরের হাড়ও ভেঙে যায়। জুলাইয়ে ট্রাইব্যুনাল তার জামিন আবেদন নাকচ করে।

কারাগারে অনেকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন না বলে অনেক পরিবার অভিযোগ করেছে। ৭৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার কবিরের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে আক্রান্ত এবং হুইলচেয়ার ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না।

বিবৃতিতে বলা হয়, ৭১ বছর বয়সী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ২২ মাস ধরে বিনা বিচারে আটক আছেন, তিনি হৃদরোগে আন্তান্ত।

আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি রমেশ চন্দ্র সেনের বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। ২০২৪ সালের আগস্টে তিনটি হত্যা মামলা ও একটি বিস্ফোরক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আটক ছিলেন। পরিবারের ভাষ্য, তাকে যথাযথ ওষুধ দেওয়া হয়নি এবং জামিনও দেওয়া হয়নি।

একই ধরনের উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এস এম জিয়াউল হক জিয়ার মৃত্যুর ক্ষেত্রেও। ৬৫ বছর বয়সী জিয়াউল হককে ৬ জানুয়ারি আটক করার সময়ই তিনি অসুস্থ ছিলেন। জামিন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ১৪ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে বিচার শুরুর আগে কাউকে আটক করা কিংবা নির্দিষ্ট শর্তে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বিচার শুরুর আগে আটক রাখার বিষয়টি ‘ ব্যতিক্রম’হওয়া উচিত, নিয়ম নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, আটক প্রত্যেক ব্যক্তির আটকাদেশ আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয় কি না, তা পর্যালোচনার জন্য একজন বিচারক বা সমমানের কর্তৃপক্ষের সামনে বিষয়টি উপস্থাপন করতে হবে। আটক ব্যক্তির দ্রুত বিচারের অধিকার রয়েছে; তা না হলে তাকে মুক্তি দিতে হবে। বিচার শুরুর আগে আরোপ করা যে কোনো বিধিনিষেধ ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, নির্দোষ বলে ধরে নেওয়ার নীতি এবং আইনের দৃষ্টিতে সমতার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

এলেইন পিয়ারসন বলেন, যে বিচার ব্যবস্থায় বয়স্ক ব্যক্তিরা অভিযোগ গঠনের আগেই হেফাজতে মারা যান, সেখানে বিচার শুরুর আগেই আটক রাখাকে কোনোভাবেই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকারের উচিত তাদের অধীনে কারাগারে হওয়া প্রতিটি মৃত্যুর স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া এবং বিনা অভিযোগে দীর্ঘ সময় ধরে খেয়ালখুশিমতো আটকে রাখা বন্ধ করা।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ